নর্থএন্ড ও গত শনিবার
১ NorthEnd
নর্থএন্ড অনেক মিস করি। কিন্তু মিস করলেও কথাটা খুব জোরে সোরে বলতে পারি না। বিবিএ পড়ার ইতিহাস থাকায় স্টেরিওটাইপিং এর শিকার হতে হয়। অথচ আইবিএতে থাকাকালীন খুব কমই নর্থএন্ডে যেতাম। আমার নর্থএন্ডের স্মৃতির প্রায় বেশিরভাগ জুড়েই গত বছরের সামার।
কফির প্রতি নেশাতুর কখনোই ছিলাম না। ইন ফ্যাক্ট, কফির ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিই ফিনল্যান্ডে আসার পর। একদিকে বাংলাদেশে সে ছিল বিরাট কফিপ্রেমী, আরেকদিকে এখানে কফির নেশাতে রিদা রমজানে রোজা থাকতে পারে না। আমি মাসখানেক ট্রাই করলাম। তারপর দেখি দাঁতের রঙ কেমন জানি পালটে যাচ্ছে। ঘুমের টাইমটেবিলও ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। এদিকে কাজের প্রতি ফোকাসও কেমন যেন কফি-ডিপেন্ডেন্ট হয়ে যাচ্ছে। জীবনে এত এত বাজে অভ্যাস। নতুন করে আর কোনো বাজে অভ্যাস না তৈরি করাই ভালো। তাই বাদ দিয়ে দিলাম। তবে এই স্বল্পসময়ের অভিজ্ঞতায় তৈরি হওয়া কিছু নাকউঁচু স্বভাব রয়ে গেল। যেমন, যারা কফিতে চিনি কিংবা দুধ মেশায়, তাদের প্রতি এখনো করুণা হয়। এসপ্রেসো শট আর অ্যামেরিক্যানো বাদ দিয়ে বাকিগুলোকে প্রপার কফি বলে স্বীকার করতে বুকে বাঁধে। ইদানীং মাঝে মাঝে কফি খাই। ভালোই লাগে।
গত সামারে দেশে গেলাম। প্রায় আড়াই মাস থাকবো। কী করবো তা জানি না। পড়াশোনা নাই। চাকরি বাকরিও নাই। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে ভিড়ের মধ্যে যখন প্রথম শ্বাস নিলাম, সেই একই ভারী বাতাস, সাথে বেশ খানিক ধুলা আর মানুষের ঘামের গন্ধের মিশ্রণ, আর কটু উষ্ণতা — খুবই চেনাপরিচিত বিক্রিয়া।
সেখান থেকে তার সাথে দেখা করতে চলে গেলাম। দেখা হলো। কেমন লাগলো এটা ব্যাখ্যা করা কঠিন। রোমাঞ্চকর, উচ্ছ্বসিত, আনন্দময়, কনফিউজড, কিংকর্তব্যবিমূঢ় — এইসব শব্দই আসছে মাথায়। তবে প্রচুর উচ্ছ্বাসের সাথে সাথে তাকে খুব অচেনাও লাগল। ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত। কারণ, আমি জানি তার সাথে আমার ইন্ট্যার্যাকশনে আমার কেমন লাগা উচিত, কী করা উচিত। গত নয়মাস ধরে প্রতিদিন ফোনে কথা বলেছি, টেক্সট করেছি। প্রায় তিন/চারশো হাজার মেসেজ। কিন্তু তবুও কোনো এক অজানা কারণে মানুষটাকে অপরিচিত মনে হচ্ছে। জনপরিসরে একজন অপরিচিত সুন্দর মানুষের প্রতি এত প্রেম পাচ্ছে এটা খুবই লজ্জার একটা ব্যাপার। সেও আমাকে পছন্দ করে এটা ভেবে আরো লজ্জায় মরে যাচ্ছি।
যা ঘটলো ব্যাপারটার সবচেয়ে কাছাকাছি উদাহরণ হতে পারে তামাশা সিনেমার প্রথম দিকটা। দুজন অপরিচিত মানুষ দুইটা চরিত্র ঠিক করে নিয়ে একে অপরের সাথে মিশছি এবং প্রেমে পড়ছি। পার্থক্যটা হলো, আমাদের দিয়ে কেউ অভিনয় করাচ্ছে না এবং কেউ কিছু ঠিকও করে দেয় নি। সবকিছু একা একাই হচ্ছে এবং আমরা দুজনই ভীষণ লাজুক।
দূর দেশ থেকে এসেছি। বাসায় আম্মু-আব্বু খাবার দাবার সাজিয়ে বসে আছে। সে আমাকে বহু জোর করলো কিছু খাওয়ার জন্য। না পেরে শেষমেশ আমাকে আমার পছন্দের চিপস এবং কয়েক প্রকার mango drink কিনে দিল।
পরবর্তী কিছুদিনে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে গেল। বন্ধুদের সাথে দেখা-সাক্ষাত হলো। ওদের সেমিস্টার মিড শুরু হল। আমি এসেছি বলে সে টার্কে গেল না। কোর্স সংখ্যা কমিয়ে দুইতে নামিয়ে আনলো। প্রারম্ভিক উত্তেজনার পারদ নেমে অবশেষে একটু থিতু হলাম শহরে। পুরো শহরে শুধু সে আর আমি, সাথে অঢেল সময়। কিছুদিনের মধ্যে অচেনা সুন্দর মানুষটার সাথেও পরিচিতিভাব এসে পড়লো। বলতে সারাদিনই তার সাথে বসে থাকি।
কোথায় বসবো এই নিয়েও কত ঝামেলা। বাইরে প্রচণ্ড গরম এবং তার থেকেও বেশি ধুলা। তার আমাদের দুজনেরই মাইগ্রেনের ঝামেলা। আমার ভার্সিটিতে সে আসবে না। আচ্ছা, না। আমি আসলে সম্ভবত কখনো তাকে বলিই নাই আসতে কারণ আমার কোনো কারণে মনে হয়েছে সে হয়ত আসবে না। তার ভার্সিটিতে আমার প্রবেশাধিকার নাই। শেষমেশ খুঁজেপেতে একটা ইন্টারেস্টিং কোর্স বের করে অডিটিং স্টুডেন্ট হিসেবে এনরোল করলাম। অন্তত এই সুবাদে সপ্তাহে দুদিন একসাথে থাকা যাবে। বাকি দিনগুলোতে কী হবে?
সারাদিন একসাথে বসে বসে কাজ করবো এমন জায়গা কই পাওয়া যায়? চাইলে হয়ত হাসপাতালের লবিতেও করা যায় (আমরা ট্রাই করি নাই যদিও)। সমস্যা হলো, আমার ম্যাকবুকে না হয় অত চার্জ দেয়া লাগে না, কিন্তু তার ঢাউস সাইজের ল্যাপটপের পেটমোটা চার্জারের জন্য থ্রি পিন চার্জিং স্টেশন না হলে তো হবে না। তাছাড়া, কাজ কিংবা পড়াশোনা করতে গেলে একটু পর পর তো ক্ষুধা লাগে, শুধু চুমুতে তো আর দিন চলে না। এছাড়া, জায়গাটা মোটামুটি নিরিবিলি হওয়া দরকার, নাহলে মনোযোগ আসবে না। কিন্তু একটু হাহা হিহি করলে কেউ যদি এসে বের করে দেয়, তাহলেও তো হবে না। এতসব কিছুর পরেও দুজনের বাসা তো ঢাকা শহরের দুইদিকে — কাছাকাছি কিছু হতে হবে। মোড় (moar) একটা ভালো অপশন। কিন্তু, সে তখন একটা প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাকে পড়ায় আর এদিকে আমি ঢাকায় পা রেখেছি পকেটে মোটাদাগে দুশো ইউরো নিয়ে। অতএব, মোড় বাদ।
একদিন প্রচণ্ড lasagna খেতে ইচ্ছে করলো। এর আগে তিন চারবার bene bistro তে গিয়েছিলাম। কেন জানি না, ওদের নীরবতা আমার বেশ পছন্দ। অদ্ভুত ব্যাপার হলো আমি সকাল বিকাল কিংবা রাত যখনই যাই না কেন, ওখানে আর কেউই থাকে না। আমি সম্ভবত একদিন একটা পরিবার ছাড়া আর কোনোদিন অন্য কোনো অতিথি দেখি নাই। সেদিনও অনেকটা একই অবস্থা। অনেক আশা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর খুবই জঘন্য lasagna বানিয়ে দিল। খেতে নিদারুণ বাজে। বিল দেবার সময় ব্যাপক হতাশা প্রকাশ করলাম। মন যোগাতে কিছু ডিসকাউন্ট দিল। মন যে তাতে বিশেষ ভালো হলো তা বলবো না।
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল। থেমে গিয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে সে আমায় নিয়ে গেল হ্যাপিনেস ক্যাফেতে। উদ্দেশ্য হলো একসাথে কিছু পড়াশোনা শেষ করা। সে একটা এসপ্রেসো শট নিল। আমি নিলাম ডায়েট কোক। তখন সম্ভবত আমার জীবনে ডায়েট কোক ফেজ চলছে। ক্যাফেটা আমার কাছে একটু কেমন যেন লাগল। ব্যাপারটা বলে বোঝানো কঠিন।
ধরেন, আপনি খানিক অপ্রস্তুতভাবে একজন স্লাভিক নারীর সামনে পড়ে গেলেন। স্বভাবসুলভভাবেই সে হয়ত দারুণ সুন্দরী, অনেকটা nonchalant এবং কিছুটা obnoxious। আপনি নিজে যত অসাধারণ ভদ্রলোকই হন না কেন, হয়ত আপনার একটু intimidated লাগবে। তাকে আপনার ভালোই লাগছে, কিন্তু কেমন জানি স্বস্তিও বোধ করছেন না।
হ্যাপিনেসের দুই পাশে খোলা জায়গা। ভেতরের ইন্টেরিয়র থেকে প্রাকৃতিক আলো বাতাসই বেশি ভালো লাগল। বাইরে গরম যেন না লাগে, তাই প্রত্যেকের জন্য আলাদা এয়ার কুলার রাখা। নিজের ভেতরের পরিবেশবাদী সত্তা একটু কষ্ট পেলেও জোর করে চুপ করিয়ে দিলাম। খানিকক্ষণ পড়াশোনা করলাম। কিন্তু তার সম্ভবত কোনো কারণে মন খারাপ অথবা ক্লান্ত। সে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকল। তারপর আমরা বের হলাম বাসায় যাবার জন্য। হ্যাপিনেসের পাশেই একটা নর্থএন্ডও আছে। বেশ সুন্দর। সে প্রথমে নর্থএন্ডেই বসতে চেয়েছিল। সম্ভবত ভিড় ছিল কিংবা আমার হয়ত ইচ্ছে হয় নাই। অ্যাসোসিয়েটেড স্টেরিওটাইপের কারণে? হয়ত। জানি না আসলে।
কিছুদিন পরে এক বিকেলে আমি বাসা থেকে বের হলাম। কারণ দুইটা। এক, বাসায় মন বসে না। বাইরে কোথাও বসে লক-ইন করতে হবে। দুই, তার সাথে দেখা করা। কিন্তু সেটা তাকে অবশ্য সরাসরি বলা যাবে না। কারণ, কোনো এক অজানা কারণে সম্ভবত খানিক রেষারেষি চলছিল।
খানিক বাদে আমি সিটি ব্যাংক সেন্টার নর্থএন্ডে বসে আছি। সে ফোন করলো, কী করছি আমি? যথাসম্ভব অস্পষ্ট করে উত্তর দিয়ে ফোন রাখলাম। বসে বসে কী যেন একটা খাচ্ছিলাম আর আশেপাশের মানুষ দেখছিলাম। পড়াশোনা কিছু তেমন হচ্ছিল না। একটু পর দেখি সে এসে উপস্থিত। সে এসে বসতে না বসতেই খেয়াল করলাম, রেষারেষি কী ছিল ভুলে গিয়েছি।
হাবিজাবি আলাপের মাঝে কিছুক্ষণ পর দুজনেই একমত হলাম, এই নর্থএন্ডের আয়োজন অনেকটাই কর্পোরেট মিটিং কেন্দ্রিক। আমাদের মনের আবহের সাথে বাইরের আবহ (vibe) মিলছে না। বের হয়ে খানিকক্ষণ কোথায় যাবো কোথায় যাবো করে রিকশায় নিয়ে কনকর্ড বখশ টাওয়ারে এসে পড়লাম।
কেন জানি এই নর্থএন্ডটা আমার খুবই পছন্দ হলো। মানুষজন, নিরিবিলি রাস্তার পাশে আউটসাইড স্মোকিং জোন, তার পাশে ফুলের গাছ সবই সুন্দর। কিছু সোফা, কিছু চেয়ার, কিছু ভিন্ন ধরণের সোফা, কিছু বার-টেবিল এবং স্টুল—আসবাবেও নানান ধরণের বৈচিত্র্য। দেখে মনে হয় অনেক ধরণের অডিয়েন্সের কথা মাথায় রেখেই সমস্ত আয়োজন। বেশ খানিকক্ষণ থাকলাম। কিছু কাজ হল। আমার যদি গোল্ডফিশের মত স্মৃতি না হত, হয়ত সেটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা শুক্রবার বলে স্বীকৃতি দিতে পারতাম। এখনো দিতে পারি, কিন্তু অন্য বেশিরভাগ শুক্রবারের কথা মনে নাই। তাই, এই স্বীকৃতির কোনো মানে থাকবে না। তবে, এটা নিশ্চিতভাবেই জীবনের সেরা চৌঠা জুলাই।
মাঝে সপ্তাহ দেড়েক ব্যস্ত সময় গেল নানু বাসায়। তারপর জুলাই মাসের শেষের দিকে নিজেকে ক্রমাগতই নানান নর্থএন্ডে খুঁজে পেতে শুরু করলাম। হ্যাপিনেসের পাশে সিটিস্কেপ, শাহাবুদ্দিন পার্ক, এলকে টাওয়ার, ধানমণ্ডি নর্থএন্ড কিছুই বাদ রইলো না। প্রত্যেক নর্থএন্ডের সাথেই নানান ধরণের ইন্টারেস্টিং এবং কম বেশি ড্রামাটিক ঘটনা জড়িয়ে আছে। গুছিয়ে লিখতে পারি না। হয়ত একদিন লিখব।
প্রত্যেক নর্থএন্ডের মেন্যু বহু অংশে একই। তাদের স্টাফও ইন্টারচেঞ্জ হয়। তবুও প্রত্যেক নর্থএন্ডের একটা আলাদা চরিত্র আছে। প্রত্যেকের ক্রাউড এবং ভিশন ভীষণ ভিন্ন। এখানে বলে রাখা ভালো, এই বিষয়ে যা বলছি তার বেশিরভাগ অবজার্ভেশন তার থেকে ধার করা এবং অনুপ্রাণিত। বখশ টাওয়ার এবং সিটিস্কেপ নর্থএন্ড কেন আমার এত পছন্দ এটা ভালো বুঝতে পারি যখন আমি ধানমণ্ডি নর্থএন্ডে যাই। ধানমণ্ডিতে ক্রাউডের একটা বড় অংশ একই এইজ গ্রুপের এবং তাদের প্রায় সবাই সেখানে পড়াশোনা, আড্ডা কিংবা প্রেম নিয়ে ব্যস্ত। সেটা খারাপ কিছু না, তবে বৈচিত্র্য নাই। কিন্তু, সিটিস্কেপ কিংবা বখশ টাওয়ারের ক্ষেত্রে এই ক্রাউডটা অনেক নানান ধরণের ইন্টারেস্টিং মানুষের মিশেলে তৈরি। বাচ্চা, বুড়ো, দেশি, বিদেশি, ছোট পরিবার, একা বসে থাকা nerd ছেলেটা, কফিডেটে আসা প্রেমিকযুগল, টিভিতে দেখতে পাওয়া গায়িকা, কিংবা অভিনেত্রী, সদ্য ভার্সিটি জয়েন করা প্রফেসর, পরকীয়া করতে আসা পেটমোটা বড়লোক, ব্যাংক শেষ করে আড্ডা দিতে আসা কলিগ—সবার একটা মিলনমেলা হয়ে যায় সন্ধ্যা-বিকেলের দিকে।
আমাদের সবার নিজের মাথায় সমাজটা কীরকম হবে এটার একটা ইউটোপিয়ান রূপ থাকে। নর্থএন্ডের সার্টেইন ব্রাঞ্চ সেই ইউটোপিয়ান রূপকে অনেক ছোট একটা স্কেলে বাস্তবে নিয়ে আসে। একটা অ্যাভারেজ জেনজি-অডিয়েন্স ফোকাসড ক্যাফে কিংবা রেস্তোরাঁয় কেমন যেন নিজেকে হঠাৎ করে নির্বাসিত মনে হয়। আউট অফ প্লেস লাগে। এরা আমার বাস্তব সমাজ কিংবা কল্পনার ইউটোপিয়ান সমাজ কোনোটারই প্রতিচ্ছবি হতে পারে না। প্রতিচ্ছবি হতে গেলে ক্রাউডের মাঝে বৈচিত্র্য এবং একধরণের রুচিবোধ লাগে।
আড্ডা দিতে কিংবা প্রেম করতে যদি এমন কোথাও যাওয়া লাগে যেখানে প্রায় সবাই আমার মত একই উদ্দেশ্যে এসেছে এবং সেখানে ভিন্ন কোনো ধরণের মানুষ নাই, তখন নিজের মনের মাঝেই হালকা খটকা জাগে যে আড্ডা বা প্রেম কি এই সমাজে নিরুৎসাহিত? না হলে আমরা সবাই এভাবে দলবদ্ধভাবে সমাজ থেকে খানিক বিছিন্ন হয়ে কেন বসলাম? এখানে ক্যাফের টার্গেট অডিয়েন্স, মার্কেট পজিশনিং, লোকেশন ইত্যাদি বিষয়ে নানান আলোচনার জন্ম হতে পারে। কিন্তু সেসব নিয়ে আমার তেমন একটা মাথা ব্যথা নাই কারণ, দিনশেষে আমার কী ভালো লাগে সেটাই শেষ কথা।
আমার ভালো লাগে তার হাত ধরতে। বন্ধুর সাথে হাহাহিহি করতে। সামনের চেয়ারে বসিয়ে ওর ছবি তুলতে। পাশের টেবিলে একটা বিদেশি পরিবারের কিউট বাচ্চাকে হ্যালো বলতে। দূরের টেবিল থেকে চলে আসা আরেকটা বাচ্চাকে সারপ্রাইজ করতে ওর ছবি এঁকে দেখাতে। স্মোকিং জোনে গিয়ে বাইরের বাতাস খেতে। কে কোন ধরণের সিগারেট খায় সেটা দেখতে। গাছ থেকে ছোট্ট ফুল ছিড়ে তার কানে গুঁজে দিতে। ছোট্ট ছোট্ট চুমু এঁকে দিতে। একই রঙের শার্ট পড়া দুজন ষাটোর্ধ বন্ধুর কথোপকথন দেখতে। পরকীয়ার লিপ্ত মোটা মানুষ এবং খানিক অসহায় দেখতে মেয়ের মিথস্ক্রিয়া দেখতে। আরেকটা চুপচাপ বসে থাকা ছেলের কাজ করা দেখতে। নানান মানুষের পিকিউলিয়ার ল্যাপটপের মডেল দেখে অবাক হতে। একজন স্টাফের জ্বর হওয়ায় কেন সকালে কাজে আসতে পারে নি সেটা জানতে।
প্রত্যেক অভিজ্ঞতার জন্য আলাদা আলাদা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে যেতে চাই না। মানুষের মাঝে কোলাহলেই নিজস্ব নির্জনতা বানাতে চাই যেখানে একটা অভিজ্ঞতা আরেকটা অভিজ্ঞতার সাথে মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ হয়ে দাঁড়াবে না। একটা র্যান্ডম ক্যাফেতে বৈচিত্র্যের অভাবে অভিজ্ঞতা অনেক একমাত্রিক হয়ে পড়ে। বৈচিত্র্য আনতে গেলে রুচিবোধের অভাবে কোলাহলের মাঝে নিজস্ব নির্জনতা লোপ পেয়ে বসে। নর্থএন্ড সেই বহুমাত্রিকতাকে খুব সহজ করে ধারণ করে।
পুরো ব্যাপারটাই হয়ত শেষমেশ অনেকের কাছে ক্লাসিস্ট মনে হবে। বিশেষত রুচিবোধের ব্যাপারটা নিয়ে আসায় অনেকের কাছেই হয়ত আমার ইচ্ছে কিংবা দেখার নজরকে এলিটিস্ট দৃষ্টিভঙ্গী বলে প্রতীয়মান হবে। আমার তাতে কিছু যায় আসে না, কারণ সবার মাথায় নিজের সমাজের একটা ইউটোপিয়ান ভার্সন থাকে। আমার ভার্সনের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো কোলাহলে মাঝে নিজস্ব নিজর্নতা এবং বহুমাত্রিকতা। এটার সাথে কোনো পার্টিকুলার শ্রেণির কোরিলেশন থাকলে আমি কী করবো?
বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা আর কোলাহলের মাঝে নিজস্ব নির্জনতা খুবই ফ্যান্সি দুইটা শব্দগুচ্ছ। একটু পার্ফরমেটিভও বটে। নিজের পার্সোনাল স্পেসই যদি চাই, চারপাশে কোলাহলটা আবার কেন দরকার তাহলে?
২ গত শনিবার
আইবিএতে ভর্তির আগে যখন ঢাকায় ছিলাম, আমার জীবন ছিল বাসা থেকে নটরডেম আর নটরডেম থেকে বাসা। মা প্রতিদিন...
থাক আরেকদিন লিখবো।
[1] কে যেন বলেছে মানুষ লেখে জীবনের স্মৃতিগুলোয় আরেকবার বাঁচতে। আমার স্মৃতি বড়ই ধোঁয়াশে। যা ঘটেছে আর যা ঘটতে পারত তার মেলবন্ধন করতেই কল্পনা এসে পড়ে। তাছাড়া আরেকবার বাঁচতে হলে হুবহু আগের মতই বাঁচতে হবে এই মাথার দিব্যি তো কেউ দেয় নি।